বাণিজ্যযুদ্ধ ঠেকাতে কুয়ালালামপুরে যুক্তরাষ্ট্র-চীন বৈঠক

বাণিজ্যযুদ্ধের নতুন ধাপ শুরুর আশঙ্কা তৈরি হওয়ায় কুয়ালালামপুরে মুখোমুখি হয়েছেন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের শীর্ষ অর্থনৈতিক কর্মকর্তারা।

বাণিজ্যযুদ্ধের নতুন ধাপ শুরুর আশঙ্কা তৈরি হওয়ায় কুয়ালালামপুরে মুখোমুখি হয়েছেন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের শীর্ষ অর্থনৈতিক কর্মকর্তারা। গতকাল অনুষ্ঠিত এ বৈঠকের লক্ষ্য ছিল দুই পরাশক্তির মধ্যে চলমান শুল্ক বিরোধ প্রশমন এবং আগামী সপ্তাহে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের মধ্যে নির্ধারিত বৈঠক নিশ্চিত করা। খবর রয়টার্স।

মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুরে চলমান আসিয়ান শীর্ষ সম্মেলনের সাইডলাইনে দুই দেশের কর্মকর্তাদের মধ্যে আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে অংশ নেন যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট, বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার ও চীনের উপপ্রধানমন্ত্রী হে লিফেং। আলোচনায় যোগ দেন চীনের প্রধান বাণিজ্য আলোচক লি চেংগ্যাংও।

আলোচনাকে ‘খুবই গঠনমূলক’ হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগের এক মুখপাত্র। তিনি বলেন, ‘বৈঠকটি আগামীকাল সকালে (স্থানীয় সময় আজ) আবার শুরু হবে বলে আমরা আশা করছি।’

বৈঠকটি এমন সময়ে অনুষ্ঠিত হলো যখন যুক্তরাষ্ট্র চীনের পণ্যে নতুন করে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছে। এর প্রতিক্রিয়ায় বেইজিং দুষ্প্রাপ্য খনিজ ও চুম্বক রফতানিতে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে। এসব পদক্ষেপে দুই দেশের মধ্যকার সমঝোতা ভেঙে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। গত মে মাস থেকে চার দফা বৈঠকের মাধ্যমে বেসেন্ট, গ্রিয়ার ও হে লিফেংয়ের নেতৃত্বে এ সমঝোতা গড়ে উঠেছিল।

বাণিজ্য সংলাপটি ট্রাম্পের এশিয়া সফর শুরুর আগেই অনুষ্ঠিত হলো। শুক্রবার রাতে তিনি ওয়াশিংটন থেকে মালয়েশিয়ার উদ্দেশে রওনা দেন। এশিয়ায় তিনি মালয়েশিয়া ছাড়াও জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া সফর করবেন। এটি চলতি বছরে তার সবচেয়ে দীর্ঘ বিদেশ সফর।

বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট শির সঙ্গে অনেক বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে হবে। চীনেরও আমাদের সঙ্গে কথা বলার যথেষ্ট কারণ আছে। আমি মনে করি, বৈঠকটি ভালোভাবে সম্পন্ন হবে।’

ট্রাম্প জানান, যুক্তরাষ্ট্রের কৃষকরা চীনের সয়াবিন আমদানি বন্ধের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। বিষয়টি আলোচনায় গুরুত্ব পাবে। তাইওয়ান ও হংকংয়ের গণমাধ্যম ব্যবসায়ী জিমি লাইয়ের মুক্তি নিয়েও কথা বলা হবে। যদিও তিনি তাইওয়ান সফরের কোনো পরিকল্পনা নেই বলে জানান।

এ বৈঠকের মূল লক্ষ্য ট্রাম্প ও শি জিনপিংয়ের মধ্যে আগামী বৃহস্পতিবার দক্ষিণ কোরিয়ায় অনুষ্ঠিতব্য এশিয়া–প্যাসিফিক ইকোনমিক কো-অপারেশন (এপেক) সম্মেলনের ফাঁকে বৈঠকটি আয়োজনের প্রস্তুতি নেয়া। আলোচনায় অন্তর্বর্তী কিছু সমঝোতা আসতে পারে। বিশেষত শুল্কছাড়, প্রযুক্তি রফতানির নিয়ন্ত্রণ শিথিল করা ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে সয়াবিন ক্রয় পুনরায় শুরু করার মতো বিষয় এতে গুরুত্ব পেতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রথম বৈঠকটি হয় চলতি বছরের মে মাসে জেনেভায়। তখন দুই দেশ ৯০ দিনের একটি অস্থায়ী চুক্তিতে পৌঁছেছিল। এতে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কহার কমে ৫৫ শতাংশে এবং চীনের শুল্কহার ৩০ শতাংশে নেমে আসে। একই সঙ্গে দুই দেশের মধ্যে দুষ্প্রাপ্য খনিজ ও চুম্বকের বাণিজ্যও পুনরায় শুরু হয়। পরে লন্ডন ও স্টকহোমে আরো দুটি বৈঠকের মাধ্যমে এ চুক্তির মেয়াদ বাড়ানো হয়, যা শেষ হওয়ার কথা ছিল ১০ নভেম্বর।

কিন্তু সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য বিভাগ রফতানি ব্ল্যাকলিস্ট সম্প্রসারণ করে, যেখানে তালিকাভুক্ত কোনো প্রতিষ্ঠানের মালিকানাধীন ৫০ শতাংশের বেশি অংশীদার কোম্পানিগুলোকেও স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিষিদ্ধ করা হয়। এতে হাজারো চীনা প্রতিষ্ঠান যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি আমদানির সুযোগ হারায়। এরপর ১০ অক্টোবর চীন পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে দুষ্প্রাপ্য খনিজের বৈশ্বিক রফতানি নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে। এর লক্ষ্য ছিল এসব খনিজের সামরিক ব্যবহার রোধ করা।

বেসেন্ট ও গ্রিয়ার চীনের পদক্ষেপকে গ্লোবাল সাপ্লাই চেইনে ক্ষমতার দখলদারি প্রচেষ্টা বলে উল্লেখ করেছেন। তারা বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও এর মিত্ররা এ নিয়ন্ত্রণ মেনে নেবে না। ট্রাম্প প্রশাসনও পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে ল্যাপটপ, জেট ইঞ্জিন ও অন্যান্য হাই–টেক সরঞ্জামের মতো সফটওয়্যারভিত্তিক পণ্য রফতানিতে নতুন সীমাবদ্ধতা আরোপের পরিকল্পনা করছে।

ওয়াশিংটনভিত্তিক সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (সিএসআইএস) চীনবিষয়ক অর্থনীতি বিশেষজ্ঞ স্কট কেনেডি বলেন, ‘আমরা এখনো জানি না যে চীন যুক্তরাষ্ট্রের রফতানি নিয়ন্ত্রণের পাল্টা ভারসাম্য তৈরি করতে পেরেছে কিনা। যদি ট্রাম্প ও সি কোনো সমঝোতায় পৌঁছান, তবে তা দুই পক্ষের জন্যই সুফল বয়ে আনবে। কিন্তু যদি ব্যর্থ হয়, তবে পরিস্থিতি আরো জটিল ও অস্থির হয়ে উঠবে।’

বিশ্বের দুই বৃহত্তম অর্থনীতি এখন এমন এক অবস্থায় রয়েছে, যেখানে আবারো তিন অংকের শুল্কযুদ্ধ ফিরে আসতে পারে। দুষ্প্রাপ্য খনিজে চীনের নিয়ন্ত্রণ যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কৌশলগত বড় চাপ তৈরি করছে। কারণ এসব উপাদান স্মার্টফোন থেকে যুদ্ধবিমান—সব ধরনের প্রযুক্তি পণ্যে অপরিহার্য। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চ শুল্কনীতি বৈশ্বিক সরবরাহ চেইনকে অস্থিতিশীল করছে এবং উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে তুলছে।

ট্রাম্প প্রশাসন শুক্রবার আরো একটি নতুন তদন্ত শুরু করেছে, যেখানে বলা হয়েছে চীন ২০২০ সালের ফেজ ওয়ান ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্টের শর্ত পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। সে চুক্তিই ছিল তার প্রথম মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্র-চীনের বাণিজ্যযুদ্ধ থামানোর প্রধান পদক্ষেপ।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি কুয়ালালামপুর বৈঠকে ইতিবাচক অগ্রগতি হয়, তবে এশিয়া–প্যাসিফিক অঞ্চলে বাণিজ্য আস্থার পুনরুদ্ধার ঘটবে এবং বৈশ্বিক বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরবে। তবে আলোচনা ভেস্তে গেলে প্রযুক্তি, জ্বালানি ও কৃষিপণ্যের বাজারে অনিশ্চয়তা আরো বাড়বে।

অ্যাটলান্টিক কাউন্সিলের জশ লিপস্কি বলেন, ‘এটি শুধু শুল্ক নিয়ে আলোচনা নয়; এটি এখন বৈশ্বিক প্রযুক্তি ও সরবরাহ চেইনের ভবিষ্যৎ নিয়েও লড়াই।’

আরও